নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এক মাসের ছুটি শেষে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে বিদায় জানিয়ে কর্মস্থলে ফিরেছিলেন শাহেদ আহমেদ আশিক। হয়তো যাওয়ার আগে সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন, স্ত্রীকে দিয়ে গিয়েছিলেন আবার ফিরে আসার আশ্বাস। স্বপ্ন ছিল, প্রবাসের কষ্টের উপার্জনে ভালো রাখবেন পরিবারকে, পূরণ করবেন সন্তানদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু কে জানত, প্রিয়জনদের কাছ থেকে সেই বিদায়ই হবে জীবনের শেষ বিদায়! সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আশিক। তাঁর মৃত্যুর খবরে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা পশ্চিমপাড়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এক নিমেষেই নিভে গেছে একটি পরিবারের স্বপ্নের আলো।
স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী। বাবার আদর-স্নেহ থেকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত হলো ১১ ও ৬ বছর বয়সী দুই ছেলে। আর সন্তান হারানোর অসহনীয় বেদনায় ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা। যে মানুষটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে হাজার মাইল দূরের দেশে ফিরে গিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুসংবাদ এখন পরিবারটির কাছে যেন এক দুঃস্বপ্ন।

নিহত শাহেদ আহমেদ আশিক বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। গত ৯ অক্টোবর পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি নেন তিনি। পরদিন ১০ অক্টোবর সকাল ৯টায় সৌদি আরবের উদ্দেশে বিমানে ওঠেন। প্রায় এক মাসের ছুটি কাটিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে আবারও প্রবাসজীবনে ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু সেই যাত্রা যে তাঁকে আর কখনো পরিবারের কাছে ফিরতে দেবে না, তা ভাবতেও পারেননি স্বজনেরা।
পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে প্রথমবারের মতো সৌদি আরবে যান আশিক। তাঁর বাবা রফিকুল ইসলামও দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে সৌদি আরবে প্রবাসী হিসেবে কাজ করছেন। তিন মাস আগে আশিকের মা ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে যান।
দেশে গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে রেখে জীবিকার তাগিদে বিদেশে কাজ করতেন আশিক। পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই ছিল তাঁর প্রবাসজীবনের অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু আকস্মিক এই মৃত্যুতে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে স্ত্রী ও দুই সন্তান।

যে বয়সে বাবার হাত ধরে বড় হওয়ার কথা, যে বয়সে বাবার কাছে আবদার আর আদরে ভরে থাকার কথা, সেই বয়সেই বাবাকে হারাল দুই শিশু। তারা হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি, তাদের বাবা আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতি যে তাদের জীবনে কত বড় শূন্যতা তৈরি করল, তার ভার বহন করতে হবে সারা জীবন।
সৌদি আরব থেকে অনলাইনের মাধ্যমে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে আশিকের মৃত্যুর খবর পৌঁছায়। প্রিয়জনের এমন আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদ মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা। যে মানুষটি মাত্র কয়েক দিন আগেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, হাসি-আনন্দে কাটিয়েছেন ছুটির দিনগুলো, সেই মানুষটির মৃত্যুসংবাদ যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁরা।
এক মাসের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় আশিকের মনে ছিল পরিবারকে ঘিরে নানা স্বপ্ন। প্রবাসের কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে স্ত্রী-সন্তানদের ভালো রাখার প্রত্যাশা ছিল তাঁর। কিন্তু একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ, ভেঙে দিল একটি পরিবারের সাজানো স্বপ্ন। মাদলা পশ্চিমপাড়ার মানুষের কাছে আশিক এখন শুধু একজন নিহত প্রবাসী নন, তিনি স্ত্রী-সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া এক বুক স্মৃতি আর অপূরণীয় শূন্যতার নাম।
জানা গেছে, শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও চার বাংলাদেশি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আহত ব্যক্তিরা রিয়াদের কিং খালেদ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এক মাসের ছুটি শেষে পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে ফিরে যাওয়া আশিকের আর ঘরে ফেরা হলো না। স্ত্রী হয়তো অপেক্ষায় ছিলেন স্বামীর ফোনের, দুই সন্তান হয়তো অপেক্ষায় ছিল বাবার সঙ্গে আবার কথা বলার। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো এক নির্মম সংবাদে।
পরিবারের জন্য স্বপ্ন বুনতে গিয়ে প্রাণ হারানো আশিক রেখে গেলেন স্ত্রী ও দুই অবুঝ সন্তানকে। তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষা আর কোনো দিন পূরণ হবে না। মাদলা পশ্চিমপাড়ার আকাশে-বাতাসে এখন স্বজন হারানোর কান্না, আর একটি পরিবারের জীবনে নেমে এসেছে এমন এক শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।





