রিজভী হক: ভোরের আলো ফোটার আগেই নওগাঁর সাপাহারের আমের বাজার জেগে ওঠে। একের পর এক ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকারদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি আমের বাজার। চারদিকে শুধু আম আর আম-আম্রপালি, ফজলি, হিমসাগর, হাড়িভাঙ্গা, বারী-৪, রূপালি, ব্যানানা ও আরও নানা জাতের আমের রঙিন সমারোহ। হাজারো মানুষের কণ্ঠ, দর-কষাকষি আর ব্যস্ততার মধ্যেই প্রতিদিন এখানে লেনদেন হয় আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ কোটি টাকার আম।
কিন্তু এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কৃষক ও বাগান মালিকদের দীর্ঘশ্বাস। চলতি মৌসুমে তীব্র দাবদাহের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই আম পেকে যাওয়ায় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে চলে এসেছে। ফলে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে গেছে। জাতভেদে প্রতি মণ আম ১ হাজার ৩০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও অনেক কৃষক উৎপাদন ব্যয় তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন।

স্থানীয় বাগান মালিকরা জানান, অতিরিক্ত গরমে আম দ্রুত পেকে যাচ্ছে। সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে ফল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কম দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে লাভ তো দূরের কথা, খরচই তুলতে পারছেন না অনেকেই।
শুধু কৃষক নন, ব্যবসায়ীরাও রয়েছেন দুশ্চিন্তায়। গরমে আম দ্রুত নরম হয়ে যাওয়ায় দূরপাল্লার পরিবহনে ঝুঁকি বেড়েছে। বাজারে আম বেশিক্ষণ রাখার সুযোগ নেই। দ্রুত বিক্রি না হলে পচন ধরে লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। ফলে প্রতিদিনই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে কেনাবেচা।
এবারের মৌসুমে আম্রপালি ও ফজলি সবচেয়ে বেশি ক্রেতা আকর্ষণ করলেও রূপালি, বারী-৪, হাড়িভাঙ্গা, হিমসাগর ও ব্যানানাসহ বিভিন্ন জাতের আমে বাজার ভরপুর। আমের গুণগত মান নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নির্ধারিত ‘আম ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আম সংগ্রহ ও বাজারজাতের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি সম্প্রতি আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘জাতীয় ফল মেলা’য় সাপাহারের প্রায় ৭০ প্রজাতির আম প্রদর্শিত হওয়ায় স্থানীয় আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও পরিচিতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের আম অর্থনীতিতে সাপাহারের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে তিন মাসব্যাপী মৌসুমে এই একটি বাজারেই প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার আম লেনদেন হয়। হাজারো কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও মৌসুমি কর্মসংস্থান এই বাজারকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।
তবে মৌসুমের ব্যস্ততার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জনভোগান্তিও। বাজারকেন্দ্রিক সড়কগুলোতে সারিবদ্ধ ট্রাক, পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহনের কারণে প্রতিদিনই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে যানবাহন। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, সাধারণ যাত্রী-সবারই দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের সীমিত তৎপরতা থাকলেও যানজট নিরসনে প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র সাপাহারের এই বাজার শুধু আম কেনাবেচার স্থান নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই এই বাজারকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করতে প্রয়োজন উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ পরিবহন, বিকল্প পার্কিং, পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ।
দাবদাহের এই মৌসুম যেন আবারও মনে করিয়ে দিল-প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলেও, সেই উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সুশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থা ও কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।





