নিজস্ব প্রতিবেদক: বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার বাইগুনী এলাকায় গ্রামীণ নারীদের জীবনে এসেছে নীরব এক বিপ্লব। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে কুমড়ো বড়ি তৈরি করে এখন অনেক নারী নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছেন। অল্প পুঁজি আর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ গ্রামীণ নারীদের আর্থিক স্বচ্ছলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

একসময় বাইগুনী এলাকার অধিকাংশ নারী ছিলেন পুরোপুরি গৃহকেন্দ্রিক। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলত সংসার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন বাড়ির আঙিনায় কিংবা উঠানে সারি সারি কুমড়ো বড়ি শুকাতে দেখা যায়। এসব বড়ি শুধু রান্নাঘরের উপকরণ নয়, বরং নারীদের আত্মনির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাইগুনী এলাকার নারীরা ভোরেই সংসারের কাজ শেষ করে বড়ি তৈরির প্রস্তুতি নেন। স্থানীয় বাজার কিংবা নিজেদের জমিতে উৎপাদিত কুমড়ো সংগ্রহ করে প্রথমে তা পরিষ্কার করে কোরানো হয়। এরপর ডাল বেটে কুমড়োর সঙ্গে মিশিয়ে প্রয়োজনীয় মসলা যোগ করা হয়। সেই মিশ্রণ ছোট ছোট বড়ির আকারে রোদে শুকানো হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় তেমন কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না। বাড়ির উঠান আর প্রাকৃতিক রোদই যথেষ্ট। ফলে নারীরা সন্তান লালন-পালন ও সংসারের অন্যান্য কাজ সামলিয়েই নিয়মিত আয় করতে পারছেন।
কুমড়ো বড়ি তৈরি করে অনেক নারী এখন আর্থিকভাবে সচ্ছল। কেউ মাসে কয়েক হাজার টাকা আয় করছেন, যা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে। আবার কেউ এই আয়ের টাকা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দিচ্ছেন।

বাইগুনী এলাকার এক নারী উদ্যোক্তা জানান, “আগে নিজের কোনো আয় ছিল না। এখন বড়ি বিক্রি করে সংসারের খরচে সহযোগিতা করতে পারছি। নিজের টাকায় কিছু করতে পারার আনন্দটাই আলাদা।”
এমন অভিজ্ঞতা শুধু একজনের নয়; এলাকার অনেক নারীই এখন নিজেদের আয় নিয়ে গর্বিত। এতে পরিবারে তাদের মতামতের গুরুত্বও বেড়েছে।
স্থানীয় বাজার ছাড়াও সোনাতলা উপজেলা সদর এবং আশপাশের হাটবাজারে বাইগুনীর কুমড়ো বড়ির চাহিদা বাড়ছে। অনেক পাইকার সরাসরি গ্রাম থেকে বড়ি সংগ্রহ করছেন। এছাড়া কিছু নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে পরিচিতজনদের কাছে বড়ি বিক্রি করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, স্বাস্থ্যসম্মত ও ঘরোয়া পদ্ধতিতে তৈরি হওয়ায় এসব বড়ির কদর বেশি। সঠিক প্যাকেটজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিং করা গেলে বাইগুনীর কুমড়ো বড়ি আরও বড় বাজার ধরতে পারবে বলে মনে করছেন তারা।

এই উদ্যোগ বাইগুনী এলাকায় নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি নারীদের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। তারা এখন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারছেন। সমাজেও নারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু নারীরাই নয়, পুরো পরিবার উপকৃত হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নারী উদ্যোক্তারা জানান, যদি সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণে সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে কুমড়ো বড়ি উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে বাইগুনী এলাকাকে একটি পরিচিত কুমড়ো বড়ি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার বাইগুনী এলাকায় কুমড়ো বড়ি তৈরি করে গ্রামীণ নারীদের সচ্ছলতা অর্জন প্রমাণ করে-ইচ্ছা আর পরিশ্রম থাকলে অল্প উদ্যোগেও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই নারীরা আজ শুধু নিজেদের জীবনই বদলাচ্ছেন না, বরং গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতিতেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।





