দিনাজপুর প্রতিনিধি: দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের সম্ভাব্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে উর্বর কৃষিজমিতে দ্রুত বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভবিষ্যতে অধিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় পরিকল্পিতভাবে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মিত ভবনগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় স্থানীয়দের কাছে এগুলো ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

এদিকে উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক জরিপে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির অন্তত ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর এসব স্থাপনা নির্মাণ বা বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় দেখা যায়, একসময় যেসব জমিতে ধান, গম ও ভুট্টার আবাদ হতো, সেখানে এখন সারি সারি তিন ও চারতলা ভবন দাঁড়িয়ে আছে। ভবনগুলোর অধিকাংশেই কোনো মানুষ বসবাস করেন না। অনেক ভবনের গেটে ঝুলছে তালা। কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ, পাকা সড়ক, ড্রেনেজসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) খনি সম্প্রসারণের জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পরই এসব কৃষিজমিতে দ্রুত বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়। তাঁদের দাবি, ক্ষতিপূরণের অর্থ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এ কাজে খনির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় দালালচক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক জরিপে খনির অন্তত ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কেউ সরাসরি, আবার কেউ বেনামে বা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে এসব স্থাপনায় বিনিয়োগ করেছেন। একই সঙ্গে একই ব্যক্তির একাধিকবার অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ওই এলাকার অধিকাংশ ভবন অনুমোদন ছাড়াই এবং নির্মাণবিধি না মেনে তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকার জমির খাজনা গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, উর্বর কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ অব্যাহত থাকলে কৃষিজমি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, তদন্তে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব ভবন নির্মাণে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরুর আগেই যারা এভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, খনি সম্প্রসারণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলে এর আগে যেসব মৌজা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। তাঁদের দাবি, ক্ষতিপূরণের অর্থ সরাসরি প্রকৃত ভূমিমালিকদের হাতে পৌঁছানো, ভূমি হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং পুরো ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব দাবি বাস্তবায়নের পরিবর্তে খনি কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করছে। ফলে জমি হারানোর আশঙ্কায় থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এদিকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি নিয়ে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কয়লা লুটপাটের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার কথা উল্লেখ করে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলে আছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার বর্তমান অবস্থা ও অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জমি অধিগ্রহণের আগে নির্মিত স্থাপনাগুলোর প্রকৃত মালিকানা, নির্মাণের সময়কাল, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ভূমিমালিক ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার যাতে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পায়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।





