নূর মোঃ কামরুল হাসান: ডিজেলের তীব্র সংকটের কারণে বোরো ধানের সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বগুড়ার চাষিরা। সেচ মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বালানির অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্বর্তন কর্মকর্তা বলছেন ডিজেল নিয়ে আতঙ্কিত না হতে।
চাষিরা জানান, বিভিন পেট্রোল পাম্প ঘুরেও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা তীব্র সংকটের কথা বলে সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটার প্রতি ২০-৩০ টাকা অধিক আদায় করছেন কিছু অসাধু স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। প্রান্তিক চাষিদের অনেকেই জানেন না উপজেলা পর্যায়ে সরকার অনুমোদিত চাষিদের প্রয়োজন মেটাতে ডিজেল বিক্রয়ের এজেন্ট রয়েছে।

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় সেচের প্রয়োজন এমন কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৯৩২ হেক্টর কৃষি জমি। চলতি বোরো মৌসুমে প্রায় ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯৫ মেট্রিকটন (চাল) উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বগুড়া জেলায় ২ হাজার ৭৯৩টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎচালিত ২ হাজার ৭৫০টি এবং ডিজেলচালিত ৪৩ টি। অগভীর নলকূপ রয়েছে ৪২ হাজার ৭৫০টি। এরমধ্যে বিদ্যুৎচালিত ১১ হাজার ২৫০টি এবং ডিজেলচালিত ৩১ হাজার ৫০০টি। এছাড়া ৪৪৩টি লো-লিফট সেচ পাম্প রয়েছে, এরমধ্যে ৩৯৩টি বিদ্যুৎচালিত ও ৫০টি ডিজেলচালিত।

শাজাহানপুর উপজেলার বৃ-কুষ্টিয়া গ্রামের কৃষক মো. সাকিব বলেন, ‘কয়েকটি তেল পাম্পে ঘুরেও ডিজেল পাইনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি লিটার ১২০ টাকায় কিনেছি। বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজেল সংকটের কারণে সেচের সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছি।
একই গ্রামের কৃষক আব্দুস ছাত্তার বলেন, “আমাদের এই গ্রামে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ টি ডিজেল চালিত শ্যালোমেশিন দিয়ে এখানে প্রায় ১৫০ বিঘার মতো কৃষি জমিতে পানির সেচ দেয়া হয়। ফলে আমাদের ডিজেল কিনতে হয়, বর্তমানে ডিজেল তেল আমরা প্রয়োজন অনুপাতে পাই না। যদিও পাই তা সরকারের নির্ধারিত মূল্য থেকে স্থানীয় বাজারে ২০-৩০ টাকা অধিক দামে কিনতে হয়। তবুও প্রয়োজন অনুপাতে যোগান হয়না।”
শাজাহানপুর উপজেলার আমরুল উত্তরপাড়ার ডিজেল চালিত সেচপাম্প ব্যবসায়ী মো: মোয়াজ্জেম আলী বলেন, “ডিজেলের দাম ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকায় উঠেছে। তবুও পর্যাপ্ত পরিমানে ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না, এই পরিস্থিতিতে সেচের খরচও বৃদ্ধি পাবে। ফলে আগে থেকেই বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপে আরও বিপাকে পরবে চাষিরা।”

শেরপুর উপজেলার কালশিমাটি গ্রামের কৃষক ও সেচপাম্প মালিক মো: নূর ইসলাম মন্ডল বলেন, “জমি প্রস্তুত, সেচ ও ফসল কাটাসহ বেশিরভাগ কৃষিকাজেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্থানীয় দোকানগুলোতে ডিজেল পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। আমার ডিজেল চালিত সেচ পাম্প মেশিন দিয়ে ৩৩ শতাংশ কৃষি জমিতে সেচ দিতে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ লিটার ডিজেল লাগে। স্থানীয় দোকানগুলোতে প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি নিচ্ছে। আমাদের মতো অনেক প্রান্তিক চাষিদের জানা নেই উপজেলা পর্যায়ে ডিজেল বিক্রয়ের এজেন্ট রয়েছে। সেখানে ন্যায্য মূল্যে ডিজেল পাওয়া যায়।”
শাজাহানপুরের মেঘনা পেট্রোলিয়ামের এজেন্ট আব্দুল হাকিম বলেন, “গত প্রায় ২০ দিন ধরে ডিজেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আমরা ৯৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে ডিজেল ক্রয় করি আর স্থানীয় চাষিদের কাছে ১শত টাকা দরে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রয় করি। সরবরাহ সঠিক ভাবে থাকলে স্থানীয় চাষিদের দুঃচিন্তা করতে হতো না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সরকার হয়তো জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনের চেষ্টা করছে। আশা করছি অচিরেই কৃষি ক্ষেত্রে জ্বালানি তেলের সমস্যার সমাধান করবে বর্তমান সরকার।”

বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, “ডিজেল নিয়ে কৃষকদের আতঙ্কিত হবার কোনো কারণ নাই। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডিজেল মজুত আছে। কৃষক যেন নিয়মিত ডিজেল পায় তার জন্য মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং চলছে।”





