নূর মোঃ কামরুল হাসান: বগুড়ায় যখনই কোনো নির্বাচন আসে তখনই সদর আসনের অবস্থানকারী ৬টি উদুভাষী (বিহারী) ক্যাম্পের ভোটারদের কদর বেড়ে যায় নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের কাছে। অনেক বছর থেকেই পৌরসভা, উপজেলা চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিহারী কলোনীর ভোটরা তাদের ভোট প্রদান করেন। বগুড়া সদরে কলোনী, চকলোকমান ও চকফরিদ এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার উর্দূভাষী ভোটার রয়েছেন।
বগুড়া জেলার সাতটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া- ৬ সংসদীয় আসন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ আসনে এবারও ছিল অবাঙালি (বিহারি) ভোটারদের চাহিদা। প্রার্থীরাও তাদের নিজেদের দিকে টানতে নতুন-নতুন কৌশল অবলম্বন করে দিয়েছেন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি।

বগুড়া জেলা শাখার বিহারিদের সংগঠন স্ট্র্যান্ডেড পাকিস্তানিস জেনারেল রিপেট্রিয়েশন কমিটি (এসপিজিআরসি) সূত্রে জানা যায়, অ-বাঙালিদের মধ্যে একটি অংশ ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে এসে বগুড়া জেলার কলোনি, চকলোকমান, মালতিনগর ও চকফরিদ এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিরা (উর্দু ভাষী) ২০০৮ সালে আদালতের এক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার লাভ করে।
বর্তমানে বগুড়া পৌরসভার ১১ ও ১২ নং ওয়ার্ডে ৬টি ক্যাম্পে প্রায় সাড়ে তিন হাজার অবাঙালি (বিহারি) ভোটার রয়েছেন।
অ-বাঙালিরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে তারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছেন। খাদ্য চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হয়। তবে প্রতিটা নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা কথা দিলেও কেউ কথা রাখেনা। সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন বলে জানান তারা।

পৌরসভার ১২ নং ওয়ার্ডের কলোনী এলাকার প্লাস্টিক হাউজ ক্যাম্পের বাসিন্দা আয়েশা বেগম বলেন, “দেশ স্বাধীনের পর থেকে এখানে থাকি। বিহারি ক্যাম্পের ছোট্ট একটি ঘরে আমি, আমার বিধবা মেয়ে, ছেলের ও ছেলের বউ, নাতি-নাতনী নিয়ে মোট ১২জনের বসবাস। এই ক্যাম্পে ৩২টি ঘর ও ৩টি গোসল খানা আছে। এখানে আমরা প্রায় শতাধিক মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাসবাস করি।”
ক্যাম্পের আরেক বাসিন্দা রেশমা জানান, “ভোট এলে বিভিন্ন প্রার্থী নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেন আমাদের; কিন্তু ভোট শেষে তারা আমাদের কথা মনে রাখে না। আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হলেও তাদের পাশে পাই না। তারা বোঝে না এখানে এতো গরীব মানুষ কষ্ট করে থাকে। বিভিন্ন ধরনের অনুদান, ত্রাণ আসলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে গেলে তারা বা তাদের লোকজন আমাদের জানান দেয়া হয়ে গেছে বা এখন নাই। আমরা দীর্ঘসময় ধরে অবহেলিত হয়ে আছি।” বলে জানান, রেশমা।
ক্যাম্পে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক’জন জানান, আমরা প্রতি নির্বাচনে ভোট দেই তবে যে, আশা নিয়ে ভোট দেই সেটা পুরণ হয় না। আমরা এখানে নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করি। অধিকাংশ পুরুষ মানুষ সেলুনে নাপিত, কাবারের দোকানে, কাপড়ের দোকানে কাজ করে। আর নারীরা অন্যের বাসা বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে।
বগুড়া জেলা শাখার এসপিজিআরসি’ র দপ্তর সম্পাদক মোঃ হুসাইন বলেন, “এই ক্যাম্পের জায়গাগুলোতে বহুতলা ভবন নির্মাণ করে আমাদের পূর্নঃবাসন করুক। আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করুক।”

বগুড়া জেলা শাখার এসপিজিআরসি’ র সভাপতি মোঃ আব্দুল কাইয়ুম সাপ্তাহিক উত্তর অঞ্চলের খবরে জানান, “আমরা দীর্ঘসময় ধরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছি। খাদ্য, চিকিৎসাসহ প্রয়োজনীয় সেবা থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত আমরা। নির্বাচন এলে কদর বাড়ে আমাদের, ভোট শেষে ভুলে যায় আমাদের কথা। সর্বক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হই আমরা।”
এবারে এ আসনে মোট ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদের মধ্যে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তারেক রহমান “ধানের শীষ” প্রতীকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পক্ষে মোঃ আবিদুর রহমান “দাঁড়িপাল্লাঃ প্রতীকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী আবু নুমান মোঃ মামুনুর রশিদ “হাতপাখা” প্রতীক, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী দিলরুবা “মই” আর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) মনোনীত প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ওয়াকি “তারা” প্রতীকে।
বগুড়া-৬ (সদর) আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৬ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৩১ লাখ ২৩৭ জনের পাশাপাশি ১০ হিজড়া ভোটারও রয়েছে।





