রবিউল ইসলাম রবি, শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধিঃ বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলী গ্রামে অনুষ্ঠিত হলো প্রায় তিনশ ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। প্রতি বছর অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিনে নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে এ মেলার আয়োজন করা হয়।
বা্ঙ্গালী সংস্কৃতির অন্যতম অনুসঙ্গ নবান্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে জামাই-বউ আর আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে মহাধুমধাম শুরু হয় বাড়ি বাড়ি।

ভোর থেকেই ভিড় জমতে থাকে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের। হাসি, আনন্দ আর কেনাবেচার কোলাহলে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবমুখর জনসমুদ্রে। এই মেলা এখন লোকজ সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
৫ কেজি থেকে ২৫ কেজি ওজনের রুই, কাতলা, বোয়াল, গ্লাসকাপ, বাঘাইর ও আইড়সহ নানা প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়েছে এ মেলায়।

নাটোরের সিংড়া উপজেলা থেকে আসা ক্রেতা ইমরানুল হক বলেন,“লোক মুখে শুনেছি উথলী মেলায় খুব বড় বড় মাছ পাওয়া যায়। তাই এবার প্রথমবার এসেছি। তবে পছন্দের মত বড় মাছও পেয়েছি। সত্যি অবাক হওয়ার মত। সবাই যেন বড় মাছ কেনা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছে!”
ওই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আতাহার আলী (৭২) স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আগে মানুষ মাথায় মাছ নিয়ে আসত। রাতে লন্ঠন জ্বেলে হাট বসত। এখন যুগ বদলেছে, কিন্তু উথলীর মেলার আয়োজন ও উৎসবের যে আবেগ তা একটুও কমেনি। নবান্নের হাটে মাছ বিক্রি না করলে নাকি বছরের মাছ ধরায় বরকত থাকে না। এটাই ছিল পুরোনো বিশ্বাস।”
এলাকার নতুন জামাই সুশান্ত কৃমার মোদক জানান, “নবান্ন উপলক্ষে এ মেলায় জামাইদের আগমন এখন এক ধরনের বিশেষ রীতি হয়েছে উঠেছে। শ্বশুরবাড়ির আমন্ত্রণে জামাইরা এ মেলায় এসে মাছ কেনেন এবং শশুড়ালয়ে নিয়ে যান। এছাড়াও এ উৎসবে শশুড় বাড়ির লোকজন জামাইকে মাছ ও মিস্টি কেনার জন্য পরবী দেন।”

রংপুরের কামাল কাছনা থেকে শ্বশুরবাড়িতে আসা জামাই উদয় কুমার বলেন,“শ্বশুরবাড়ির লোকজন আগেই বলে দিয়েছে- উথলীর মেলায় গিয়া ভালো একটা বড় মাছ নিতে হবে। তাই এসেছি। জামাই বলে কথা। এ মেলায় না এলে নবান্নই অসম্পূর্ণ থেকে যায়”।

শিবগঞ্জ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ আসে বড় মাছ দেখতে এবং কিনতে। মেলাপ্রাঙ্গণের দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতা রাজিকুল ইসলাম রনি বলেন, “এই মেলার নাম সারা দেশে। ৩’শ বছরের পুরানো এ মেলায় আলাদা একটা ইতিহাস আছে, আছে আলাদা আমেজ আছে।”
মাছ বিক্রেতা সুজন সরকার বলেন, “এই মেলার ক্রেতারা অন্যরকম। তারা দাম বুঝে শুনে মাছ কেনেন। আর জামাইরা তো দামও কম বলেন না- শ্বশুরবাড়ির মান রাখতে বড় মাছই নেন। তবে এবারে মাছের আমদানি বেশি হলেও দাম কিছুটা কম। ছোট বড় ১’শ মাছের দোকান বসেছে এ মাছের মেলায়। এবার কোটি টাকার অধিক মাছ বিক্রি হবে এ নবান্ন মেলায়।

এ মেলায় মাছের পাশাপাশি মিস্টি ও নারীদের নানা ধরনের গহণা ও সাজ সজ্জার দোকান বসেছে। আছে শিশুদের জন্য নানা ধরনের খেলনা ও বিনোদনের ব্যবস্থা।
মেলায় নতুন আলু, মুলা, শিম, বাঁধাকপি, লাউসহ নানা শীতকালীন সবজি, পানিফল, খেজুরের রস, চুইঝাল, মুড়ি মুড়কি ও মাটির তৈজসপত্রেট ঐতিহ্য রয়েছে। এ মেলার নতুন সবজি ছাড়া এলাকার বউঝিরা চুলায় আগুন দেয়না।
উথলী নবান্ন মাছের মেলা একটি ঐতিহাসিক আয়োজন। এবারের মেলায় মানুষের নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজক কমিটি ও প্রশাসনের সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।





