কী? শিরোনাম দেখে অবাক হলেন তো? হ্যাঁ, এটাই বাস্তব যে কাগজে বা ক্যানভাসে ছবি আঁকার আগে ছবি আঁকতে হয় নিজের মনের মধ্যে।
শিশুরা যখন ছোট থাকে, যখন তারা নতুন নতুন বুলি শিখে তখন তারা পারিপার্শ্বিক সবকিছুকে মনের মত করে ভাবতে শিখে। তার হাতে কলম ধরিয়ে দিলেই সে নিজের মনের মতো করে আঁকিবুকি করতে থাকে। আর সেই আঁকিবুকি থেকেই শুরু হয় শিল্পকলায় তার হাতেখড়ি।
সুতরাং জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিটি মানুষ এক একজন শিল্পী। আপনি মানুন কিংবা নাই মানুন, এটাই সত্য। একজন দক্ষ উপস্থাপক তার সুন্দর বচন দিয়েই শিল্প আঁকে। একজন দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার তার সুন্দর পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে শিল্পের প্রকাশ ঘটায়। একজন দর্জি তার সুনিপুণ সেলাইয়ের মাধ্যমেই শিল্পকে তুলে ধরে। এমনকি একজন দক্ষ কাঠমিস্ত্রিও কঠিন কাঠের মধ্যে চোখ জুড়ানো কোমল শিল্প আঁকে। প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখতে পাই, মানুষ ছাড়াও অবুঝ প্রাণিদের মধ্যেও কত কত যে শিল্প লুকিয়ে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। বাবুই পাখির অসাধারণ কুঁড়েঘর নির্মাণশৈলী, উইপোকার মৃত্তিকার ঘর ইত্যাদি।
চারুকলা একটি ভাষার নাম। একটি আঁকা ছবি হাজারটি কথার সমান। এই চারুকলার যাত্রা শুরু হয়েছিল মানুষের মধ্যে পরস্পর ভাব আদান-প্রদানের প্রয়োজনে। অর্থাৎ আক্ষরিক প্রথা প্রচলিত হওয়ার আগেই ছবি আঁকার প্রচলন ঘটেছিল বলে ইতিহাসবেত্তাগণের ধারণা। সুতরাং মনের মধ্যে জেগে ওঠা ভাবের বিনিময় বা ভাবের প্রকাশের জন্যেই চারুকলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছবি আঁকা কেবলই বিনোদন নয়, বরং বৈশ্বিক ও সামাজিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরার একটি অনন্য মাধ্যম। যেমনটা করেছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, এস এম সুলতান প্রমুখ ব্যাক্তিগণ।
প্রিয় শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আপনারাও নিমিষেই ছবি আঁকতে পারবেন যদি দু-একটা বিষয় মাথায় রাখা যায়। প্রথমত, মন থেকে সকল ভয় ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। মনে রাখবেন আপনি যাই আঁকবেন তাই শিল্প। পেন্সিল, কলম কিংবা রং-তুলি হাতে নিন আর ইচ্ছেমতো রং নিয়ে খেলা করুন। এভাবে খেলার ছলেই মনের অজান্তে কবে যে শিল্পী হয়ে উঠবেন আপনি টেরই পাবেন না।
রঙের কম্বিনেশন নিয়ে না ভেবে আজই রঙ নিয়ে আঁকতে শুরু করুন যা খুশি। ধীরে ধীরে নিজেই আবিষ্কার করবেন আপনাকে কোন কোন রং কোথায় ব্যবহার করতে হবে, কী পরিমাণে ব্যবহার করতে হবে। প্রকৃতির বিভিন্ন অবয়বগুলো নিজের মনের মতো করে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করবেন। কিন্তু শর্ত হলো, যা কিছু আঁকবেন তা যেন আগে আপনার মনের মধ্যেই আঁকা হয়। অর্থাৎ আগে আপনার কল্পনার জগতে সেই ছবিটার পরিকল্পনা করা।
আমিও আমার স্বভাবজাত ইচ্ছাতেই ছবি আঁকা শুরু করেছিলাম। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল আমার। বড় ভাই তাজমিনুর রহমানের কাছে ছবি আঁকার হাতেখড়ি হয়েছিল। আর ছবি আঁকার ধরনটা ছিল সবসময়ই নিজের মতো, নিজের ইচ্ছেমতো। আমার আঁকা ছবিতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য, মায়ের ভালোবাসা, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম। হয়তো মন থেকে আঁকার চেষ্টা করেছি বলেই, একটু ভিন্নভাবে ও আলাদাভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি বলেই আমার শিল্পকর্ম এশিয়া বুক অব রেকর্ডস-এ স্থান করে নিতে পেরেছে। আমার আরেকটি অন্যতম অর্জন হলো- চারু ও কারুকলা ক্যাটাগরিতে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২২’। এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মিলে প্রায় ১৮টি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে আমার ছবি প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছি। সেই সাথে তিনটি একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। পেয়েছি নানান সম্মাননা স্মারক। শিল্প জীবনের শুরুর দিকেই এই অর্জনগুলো আমার জন্য বাকি জীবনের পাথেয় হিসেবে রইল।
আপনারা যারা শিল্পকে ভালোবাসেন, শিল্পের মধ্যে নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান, তাদের জন্যই শিল্পকলা বা চারুকলা। ছবি আঁকাই হোক সকলের মনের খোরাক, হোক সেটা কাগজে নতুবা মনের ভাঁজে।
লেখা-
মো: তারিকুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষক (চারু ও কারুকলা)
শহীদ লেফটেন্যান্ট তানজিম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ





