নূর মোঃ কামরুল হাসান: চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বগুড়ার গাবতলী ও শেরপুর উপজেলার কুমোরপাড়ার মৃৎশিল্পীরা এখন কর্মব্যস্ততার চরম সময় পার করছেন। গ্রামীণ জনপদজুড়ে বসতে যাওয়া বারণীসহ বিভিন্ন মেলাকে ঘিরে তারা রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন মাটির নান্দনিক সব তৈজসপত্র ও শিশুদের খেলনা।

বাংলার চিরায়ত লোকউৎসব চড়ক মেলা ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে প্রতি বছরই গ্রামবাংলা হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এর পরদিনই বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এই দুই উৎসবকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পীদের দম ফেলার সময় নেই। মাটির তৈরি বিভিন্ন খেলনা ও তৈজসপত্র তৈরি, শুকানো ও পোড়ানোর কাজ শেষ করে এখন চলছে রঙের ছোঁয়ায় সেগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলার ব্যস্ততা।
ঈদ, পূজা-পার্বণ ও বিভিন্ন মেলায় মাটির জিনিসের চাহিদা বাড়লেও বছরের অধিকাংশ সময়ই আর্থিক টানাপোড়েনে কাটে কুমোরদের জীবন। তবে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলাকে ঘিরেই তারা কিছুটা আয়ের মুখ দেখেন। এই সময়টাতে তাদের তৈরি পণ্য গ্রামীণ মেলায় ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ে এবং ছড়িয়ে দেয় ঐতিহ্যের আবহ।

সরেজমিনে দেখা যায়,গাবতলী উপজেলার বারুনিয়া পালপাড়া গ্রামে এখন ২টি পরিবার মাটির তৈরি খেলনা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। প্রতিটি বাড়ির উঠানজুড়ে সাজানো মাটির তৈজসপত্র ও খেলনা। ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করছেন। হাড়ি-পাতিল, সানকি, মাটির ব্যাংক, ফুলের টবের পাশাপাশি শিশুদের জন্য পুতুল, হাতি, ঘোড়া, নৌকা, চুলা ও বিভিন্ন আকৃতির খেলনা তৈরি ও রঙ করার কাজে ব্যস্ত তারা।
গাবতলীর বরুনিয়া গ্রামের মৃৎশিল্পী নরেন্দ্র পাল জানান, প্লাস্টিকের আধিপত্যে মাটির খেলনার চাহিদা আগের তুলনায় কমে গেলেও চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলাগুলোতে এখনও এসব পণ্যের কদর রয়েছে। “মেলাকে কেন্দ্র করে আমরা নিজেরাও খেলনা তৈরি করি। আবার দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রং করা মাটির খেলনা কিনে এনে মেলায় বিক্রি করি।

গাবতলীর বরুনিয়া গ্রামের মৃৎশিল্পী একাদশী রানী পাল বলেন, চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন ধরনের খেলনা তৈরি করছি। এখন সেগুলো শুকানো,পোড়ানো এবং রঙ করার কাজ শেষের দিকে। আমি ও আমার স্বামী মিলে খেলনা তৈরি করেছি। আশা করি প্রতিটি খেলনা ১০ থেকে ২৫ টাকা দরে বিক্রি হবে।
তিনি আরো জানান, প্লাস্টিক পণ্যের কারণে মাটির জিনিসের কদর কমলেও গ্রামীণ মেলাগুলোতেই এখনো এর চাহিদা টিকে রয়েছে মাটির খেলনার।

গাবতলীর বরুনিয়া গ্রামের মৃৎশিল্পী অনাথ পাল বলেন, আগের মতো মাটির জিনিসের বাজার না থাকলেও চৈত্র ও বৈশাখ এলেই চাহিদা বাড়ে। এ সময়টাতেই সারা বছরের কিছু আয় হয়। আগে চাকা ঘুরিয়ে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করতাম। এখন সময়ের বিবর্তনে বিদ্যুৎ চালিত মোটর দিয়ে চাকা ঘুরিয়ে তৈরি করি নানা রকমের মাটির জিনিসপত্র। আগে মাটি পাওয়া যেত, কিন্তু এখন আর মাটিও পাওয়া যায় না। আমাদের কাজই যেখানে মাটি নিয়ে, সেখানে মাটি সংকটই আমাদের কাল। আগে এক ট্রলি মাটি পাওয়া যেতো ১২শ টাকায়, বর্তমানে দাম পড়ে প্রায় ২ হাজার টাকা। অন্যদিকে খড়ির দামও বেশি। ফলে মাটির জিনিস উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু সেই হিসেবে লাভ সীমিত।
গাবতলীর বরুনিয়া গ্রামের অমেন চন্দ্র পাল বলেন, আগে মাটির জিনিস বিক্রি করে তাদের সংসার চলত। কাঁচামাল সংকট, জনসাধারণের মাটির জিনিসপত্রের ব্যবহারে অনীহা, আধুনিকতার ছোঁয়া, সরকারি অনুদানের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে এখানকার মৃৎশিল্প। বর্তমানে এ গ্রামের দুইটি পরিবার মাটির তৈরি খেলনা তৈরি করে বৈশাখসহ বিভিন্ন মেলায় বিক্রি করে। অথচ আজ থেকে ১৫ বছর আগে এই গ্রামের ৫০ থেকে ৬০ ঘরের প্রায় ২০০ জন মানুষ ছিল এই পেশায়।

শেরপুরের গোপাল চন্দ্র পাল বলেন, পূর্বপুরুষদের ব্যবসা বলে এটা ছাড়তেও পারি না। এই কাজ ছাড়া অন্য কাজ শিখি নাই। তাই ধরে আছি। ঈদ, পূজা-পার্বণ ও বিভিন্ন মেলায় মাটির জিনিসের চাহিদা বাড়লেও বছরের অধিকাংশ সময়ই আর্থিক টানাপোড়েনে কাটে আমাদের জীবনে। তবে চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলাকে ঘিরেই তারা কিছুটা আয়ের মুখ দেখি। এই সময়টাতে আমাদের তৈরি পণ্য বিভিন্ন মেলায় ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ে।





